একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, কোল্ড স্টোরেজ দিয়ে যার ব্যবসার সূত্রপাত, তার ব্যবসায় এখন সেকেন্ড জেনারেশন চলছে। তার ছেলে এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন। বাবার রেডি ব্যবসা, নিজের পড়াশোনা আর বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগাচ্ছেন। খুব দ্রুত বিশাল বিশাল দুটো অটোরাইস মিল দিয়ে ফেলেছেন।

আর এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ব্যবসা শুরু করেছিলেন হাটে হাটে সাইকেলে করে জিনিসপত্র বেচে। এখন তার ভাই ভাতিজা থেকে শুরু করে পরিবারের সবাই বড় বড় ব্যবসায়ী। কথিত আছে তাদের ফ্যামিলির আন্ডাবাচ্চাদেরও নাকি কয়েক কোটি টাকার করে স্টক বিজনেস। অতি সম্প্রতি তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন কিন্তু রেখে গেছেন বিরাট ব্যবসায়িক লেগাছি। এখন তার ছেলেমেয়েরা ক্রমাগত ব্যবসা বাড়িয়েই চলেছেন।

এটা মাত্র দুটো কেস স্টাডি। আমি নিশ্চিত আমাদের সকলের আশেপাশে এরকম অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। ব্যবসার অনেকগুলো পজিটিভ দিকের একটা হলো আপনি আপনার নেক্সট জেনারেশনের জন্য ভিত্তি রেখে যাচ্ছেন। আপনি তিল তিল করে যে ব্যবসা গড়ে তুলছেন, আপনার সন্তানেরা সেখান থেকে নেক্সট লেভেলে নিয়ে যাবে আপনার ব্যবসাকে।

ফেসবুকেই একবার সমুচা বিক্রেতা আর কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের এক ম্যানেজারের কথোপকথন শেয়ার করেছিলাম। গল্পটা মোটামুটি এরকম:

“একজন সমুচা বিক্রেতা ছিলেন। তাঁর দোকানটা ছিল অনেক বড় একটি কোম্পানির সামনে। ঐ এলাকার মানুষের কাছে তার সমুচা ছিল খুবই জনপ্রিয় ।ঐ কোম্পানির অনেক কর্মচারী তার দোকানে আসতো সমুচা খেতে।

একদিন ঐ বড় কোম্পানির একজন ম্যানেজার সমুচার দোকানে এলেন সমুচা খেতে। সমুচা খেতে খেতে দোকানের মালিক কে বললেন “আপনি আপনার দোকান কত সুন্দর ভাবে পরিচালনা করেন আর আপনার managerial skill ও বেশ ভালো তাহলে আপনি কেন একটি ভালো চাকুরী খুজে নিচ্ছেন না, শুধু শুধু নিজের মূল্যবান সময় আর মেধাটুকু নষ্ট করছেন। যদি একটি ভালো কাজ জোগাড় করে নিতেন, তাহলে এত দিনে আপনি আমার মত ম্যানেজার হয়ে যেতেন”।

বেচারা সমুচা ওয়ালা একটি হাসি দিয়ে বললেন “স্যার, আমার কাজটা আপনার কাজের চেয়ে ভালো, কীভাবে? শুনুন তাহলে। ১০ বছর আগে আমি একটি টুকরিতে করে সমুচা বিক্রি করতাম। আর তখন আপনি এই কোম্পানিতে নতুন জব পেয়েছিলেন। তখন আমি মাসে ১০০০ টাকা কামাতাম আর আপনি ১০,০০০ টাকা বেতন পেতেন।

এই ১০ বছরের জার্নি তে আমরা দুজনই অনেক দূর এগিয়েছি।

এখন আপনি ইনকাম করছেন মাসে ১ লাখ আর আমিও আপনার সমান , মাঝে মাঝ বেশিও হচ্ছে সেটা। তাহলে আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি আমার কাজটি আপনার কাজের চেয়েও ভালো।

আচ্ছা আমি আরেকটু ব্যাখ্যা করি তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে আপনার। আমার কথা গুলো একটু মন দিয়ে শুনবেন। আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম খুব অল্প ইনকাম দিয়ে কিন্তু আমার ছেলে মেয়েকে সেটা করতে হবে না। একদিন আমার ছেলে আমার ব্যবসার দায়িত্ব নেবে আর সে অবশ্যই একটি পরিপূর্ণ ব্যবসা থেকেই তার ক্যারিয়ার শুরু করবে কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে পুরো সুবিধাটাই পেয়ে যাবে আপনার বসের ছেলে মেয়ে, আপনার ছেলে মেয়ে না।

আপনি কোনদিনও আপনার ছেলে মেয়েকে আপনার পজিশনটা দিয়ে যেতে পারবেন না। তাদের শুরু করতে হবে শূন্য থেকেই। আমরা দুজনই ১০ বছর আগে যেই সমস্যাগুলো মোকাবেলা করে আমাদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, আপনার সন্তান ও ঠিক একিভাবে সেই কাজটাই করবে।

আপনার ছেলে যখন ১০,০০০ টাকা (বা হয়ত ৩০,০০০ টাকা) দিয়ে তার জব স্টার্ট করবে আমার ছেলে তখন আমাদের ব্যবসা কে আরও বড় করার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর আপনার ছেলে যখন ম্যানেজার হবে তখন আমার ছেলে অনেক দূর পৌঁছে যাবে।

এখন আপনি আমাকে বলুন কে সময় আর মেধা নষ্ট করছে, আপনি নাকি আমি?

ম্যানেজার সমুচা বিক্রেতাকে সমুচার দাম দিয়ে দোকান থেকে চলে গেলেন, একটা কথাও বললেন না।”

গল্পটার ক্যালকুলেশনে অনেক ‘যদি’, ‘কিন্তু’ থাকলেও মোরালটা খুব স্পষ্ট। একজন সচিব যতো দক্ষই হোক, তার ছেলেমেয়ে বাবার সাচিবিক দক্ষতা থেকে ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র উপকৃত হবেন না, তাদের স্ক্র‍্যচ থেকেই শুরু করতে হবে। বাবার চাকরী শেষ হলে সরকারী কোয়ার্টারটা ছেড়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে একজন সবজি বিক্রেতাও তার ছেলেমেয়ের জন্য ন্যুনতম ভিত্তিটুকু রেখে যান। বাবার সবজির ব্যবসার পাশাপাশি অন্য ব্যবসাও শুরু করার সুযোগ সে পায়।

পুরান ঢাকায় অধিকাংশ ব্যবসায় এখন সেকেন্ড জেনারেশন চলছে। বাবার নাটবল্টুর দোকান দেখার পাশাপাশি ছেলে এখন নাটবল্টুর কারখানা খুলে বসেছে। বাবা ফ্যান বেচলে, ছেলে ফ্যান তৈরীর কারখানা খুলে বসেছে।

যাদের বাবারা ব্যবসায়ী, তারা খুবই লাকি। চিন্তা করে দেখুন, আপনি একটা ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পুরাতন রেডি ব্যবসা দিয়ে শুরু করছেন। আপনার বাবা এতোদিন ধরে তিল তিল করে যে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, ব্র‍্যান্ড ইমেজ গড়েছেন, গুডউইল তৈরী করেছেন, আপনি সেটা রেডিমেড পাচ্ছেন। আপনি আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, টেকনোলজিকাল জ্ঞান আর রক্তে মিশে থাকা ব্যবসার কণিকাকে কাজে লাগিয়ে সেটাকে নেক্সট ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

আর যাদের ব্যবসায়ী বাবা নেই, তারা হাহুতাশ না করে, ত্রিশ বছর পর আপনার সন্তানেরা যাতে হাহুতাশ না করে সেই ব্যবস্থা করুন। শুরু থেকেই শুরু করুন, পরিশ্রম করুন। ইন শা আল্লাহ আপনার চাকুরীজীবী বন্ধুদের সন্তানের চেয়ে আপনি আপনার সন্তানের জন্য একটি উত্তম ভবিষ্যৎ রেখে যাবেন।

20770418_1409539202475073_4564195872586595836_n

12439091_842577305870192_3277621181040430147_n
Engr. Atiqur Rahman