নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সমাধানযাত্রা’র কথা বলেছিলেন সদ্য প্রয়াত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। প্রতিশ্রুতি ছিল স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকাকে একটি স্মার্ট, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলবেন। আড়াই বছরে তাঁর কিছু পদক্ষেপ নগরবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে বেশ কঠিন। কিন্তু তিনি সফলভাবে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।

মুক্ত সাতরাস্তা: সাতরাস্তার মোড় থেকে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কে ছিল ট্রাকস্ট্যান্ড। বহু বছর ধরে প্রশাসন এই রাস্তা উদ্ধার করতে পারেনি। মেয়র আনিসুল হক সেই রাস্তা নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেছেন। সংস্কারে বদলে গেছে সে রাস্তার চেহারা।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সড়কটি দখলমুক্ত করতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ চালক ও শ্রমিকদের প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন মেয়র।
প্রায় এক শ ফুট চওড়া এই সড়ক ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকাকে তেজগাঁও মহাখালী ও বনানী-গুলশান-নিকেতনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকার অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট ও কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রধান কার্যালয়সহ বহু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও সাধারণ মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন।

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা পার্কিংমুক্ত: টেকনিক্যাল মোড় থেকে গাবতলী হয়ে আমিনবাজার সেতু পর্যন্ত যেতে আগে ৪০-৪৫ মিনিট সময় লাগত। কারণ, টার্মিনালের বাইরে রাস্তার দুপাশজুড়ে বাস-ট্রাক পার্ক করে রাখা হতো। এখন যাওয়া যায় পাঁচ-সাত মিনিটে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কল্যাণপুর-গাবতলী হয়ে আমিনবাজার পর্যন্ত সড়কটি অবৈধ পার্কিংমুক্ত করা হয় মেয়র আনিসুল হকের নেতৃত্বে।

সড়ক, অবকাঠামো ও ফুটপাত উন্নয়ন: গত আড়াই বছরে উত্তরা, গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ কয়েকটি এলাকায় তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭৬ কিলোমিটার সড়ক, ২৪২ কিলোমিটার নর্দমা ও ৬৯ কিলোমিটার প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত উন্নয়নের কাজ করা হয়েছে। রায়েরবাজারে ৫২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কবরস্থান। গাবতলীর গৈদারটেক এলাকায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সড়কসেতু।

গুলশান, বনানীর পর তাঁর নজর দেওয়ার কথা ছিল মোহাম্মদপুর, মিরপুর, খিলগাঁও এলাকায়।

দূতাবাস এলাকার ফুটপাতের স্থাপনা উচ্ছেদ: চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গুলশান ও বারিধারা এলাকায় দূতাবাসের সামনের ফুটপাতে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন মেয়র আনিসুল হক। দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের এর জন্য রাজি করান তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে পর্যায়ক্রমে ইতালি, পাকিস্তান, সৌদি আরব, রাশিয়া, পাকিস্তান, কানাডাসহ কয়েকটি দূতাবাসের অননুমোদিত স্থাপনা সরিয়ে দেয় ডিএনসিসি। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস নিজ উদ্যোগে ফুটপাত খালি করে দেয়।

৫৩টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ: নির্বাচনের পর থেকে ডিএনসিসি এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে ৫২টি এসটিএস নির্মাণের মাধ্যমে। প্রগতি সরণিসহ আগে শহরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কনটেইনার রেখে বর্জ্য সংগ্রহ করা হতো। এতে ব্যস্ত সড়কে দুর্গন্ধ ছড়াত, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতো। এই ব্যবস্থায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা আসতে শুরু করেছে।

১১টি আধুনিক গণশৌচাগার: ডিএনসিসির উদ্যোগে ও ওয়াটারএইডের সহযোগিতায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, মহাখালী কাঁচাবাজার, নাবিস্কো মোড়, ফার্মগেট, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও সাতরাস্তা, শ্যামলী পার্কসহ মোট ১১টি জায়গায় আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে গত আড়াই বছরে।

বিলবোর্ড অপসারণ: বহুতল ভবন, দেয়াল কিংবা উঁচু জায়গায় স্থাপিত আকাশ ঢেকে ফেলা বিলবোর্ড কিংবা সড়কের দুপাশ ঢেকে ফেলা বিলবোর্ড অপসারণ ছিল আনিসুল হকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ। ডিএনসিসির আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ হাজারের বেশি বিলবোর্ড অপসারণ করা হয়েছে তাঁর উদ্যোগে। বিশেষ করে বিমানবন্দর সড়কের দুপাশের বিলবোর্ড সরানোর পর বদলে যায় এই এলাকায় ঘিঞ্জি অবস্থা।

ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থা চালু: এই কাজটি করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় বিরোধিতার মুখে পড়েন মেয়র। এই বিরোধিতা আসে খোদ তাঁর কাউন্সিলরদের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হন। এতে দরপত্র নিয়ে চিরাচরিত হামলা, জালিয়াতি, দরপত্রের বাক্স ছিনতাইয়ের সংস্কৃতিমুক্ত হয় সিটি করপোরেশন। আসে স্বচ্ছতাও। সিটি করপোরেশনের সমুদয় ক্রয়প্রক্রিয়াও অনলাইনের আওতায় আনা হয়।

ইউটার্ন: যানজট কমাতে আবদুল্লাহপুর থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা পর্যন্ত ১২টি ইউটার্ন (লেন পরিবর্তন করতে ভূমিতেই গাড়ি ঘোরানোর জায়গা) নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ইউটার্নগুলো তৈরি হলে বিমানবন্দর সড়কের যানজট প্রায় ২৫ শতাংশ কমবে।

নগর মোবাইল অ্যাপ: উত্তর সিটি করপোরেশনে চালু করা হয়েছে নগর নামের একটি মোবাইল অ্যাপ। যার মাধ্যমে ঘরে বসেই নাগরিকেরা ডিএনসিসির সেবা কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। সরাসরি অভিযোগ কিংবা পরামর্শের কথা জানাতে পারেন মেয়রকে।

মোনায়েম খানের বাড়ির সামনের রাস্তা মুক্ত করা: গত বছরের ৩ নভেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী মোনায়েম খানের বনানীর বাড়ির একাংশ উচ্ছেদ করা হয়। বাগ-ই-মোনায়েম নামের ওই বাড়ির সামনের প্রায় ১০ কাঠা জমি প্রায় ৪৫ বছর ধরে দখলে রাখা হয়েছিল। উচ্ছেদ অভিযানের দিনটিকে ‘স্মরণীয় দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধীর বাড়ির জমি বাজেয়াপ্ত করতে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

ডিএনসিসির কর্মচারীদের কল্যাণে কর্মসূচি: আনিসুল হকের উদ্যোগে ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দৈনিক মজুরি ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭৫ টাকা করা হয়। নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে এক লাখ টাকা জীবনবিমা ও সাত লাখ টাকার অনুদান এবং গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে দুই লাখ টাকার অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়। কাউন্সিলরদের জন্যও একই হারে অনুদানের ব্যবস্থা করেন তিনি। দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য পোশাক ও জুতার পাশাপাশি বছরে দুটি উৎসব ভাতা চালু করা হয়।
গুলশান, বনানী ও বারিধারায় ‘ঢাকা চাকা’ ও বিশেষ রিকশা: ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট ‘ঢাকা চাকা’ নামে গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকায় প্রথম দফায় ৩৫ আসনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ১০টি বাস নিয়ে চালু করে ডিএনসিসি। নিটল-নিলয় গ্রুপের পক্ষ থেকে বাসগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে।
একই দিনে গুলশানে ২০০, বনানীতে ২০০, বারিধারায় ও নিকেতনে ৫০টি করে বিশেষ রঙের রিকশা চালু করেছিলেন আনিসুল হক। ডিএনসিসি বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়া নির্ধারণ করে তার তালিকা রিকশায় লাগিয়ে দিয়েছে।

গুলশান থেকে গামকা কার্যালয় স্থানান্তর: স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গুলশানের ৯৪ নম্বর সড়কে অবস্থিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল অ্যাপ্রুভড মেডিকেল সেন্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (গামকা) কার্যালয় সরানোর ব্যবস্থা করেন আনিসুল হক। স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিবন্ধনপত্র নিতে প্রতিদিন ভোর থেকে কয়েক হাজার মানুষ এই কার্যালয়ে জড়ো হতো। এতে কয়েকটি এলাকায় যানজট তৈরি হতো। গামকার ওই কার্যালয় মাদানীনগরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

BD Online Media

mayor