আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় রাত সাড়ে ১২টায়। কিন্তু এর এক ঘণ্টা আগেই তা ফেসবুকে ফাঁস করে দেয় একটি কোচিং সেন্টার। এ ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায়। চট্টগ্রাম নগরের নয়টি সরকারি বিদ্যালয়ের একটি হচ্ছে কলেজিয়েট স্কুল।

কলেজিয়েট স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীদের সহযোগিতায় ‘বাবলা স্যার কোচিং সেন্টার’ নির্ধারিত সময়ের আগেই ফল ফাঁস করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক তদন্তে তার প্রমাণও পেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন মামলাও করেছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসক আজ সোমবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন।

সম্প্রতি প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের একের পর এক ঘটনা ঘটছে। তবে এবার ফল ফাঁসের ঘটনা ঘটল। চলতি বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় একটি বিদ্যালয়ের ফল নির্ধারিত সময়ের আগে ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মর্জিনা আক্তার বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ফল ফাঁসের ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট থানায় মামলা হয়েছে। এতে কলেজিয়েট স্কুলের দুই সহকারী শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন ও আনিছ ফারুক, কম্পিউটার অপারেটর রিদুয়ানুল হক ও উচ্চমান সহকারী মো. ফারুক আহমেদ এবং বাবলা স্যার কোচিং সেন্টারের পরিচালক বাবলা দে ও মামুন কোচিং সেন্টারের পরিচালক মো. মামুনকে আসামি করা হয়েছে। রিদুয়ানুল হককে বিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাশ।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও ) হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট ও কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষকদের উপস্থিতি ফলাফল তৈরি করা হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর সহায়তায় একটি কোচিং সেন্টার জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরের আগেই তা ফাঁস করে দেন। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।

ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ফাঁসের ঘটনায় আজ সোমবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর করা এক বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এই বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯ ডিসেম্বর সকালে তিনটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়গুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও বাকলিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় (বালক শাখা)। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট (www.chittagong.gov.bd) এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরের আগেই চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশের খবর পাওয়া যায়।

স্বাক্ষরের আগেই ফল ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ফলাফল তৈরি করে এর প্রিন্ট কপি জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরের জন্য নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ওই কেন্দ্রের কম্পিউটারে সংরক্ষিত কপি পুনরায় প্রিন্ট করে শিক্ষক ও কর্মচারী এবং কয়েকজন অভিভাবকের সহায়তায় ‘বাবলা স্যার কোচিং সেন্টারের’ পরিচালক বাবলা দেকে সরবরাহ করা হয়। আর মামুন কোচিং সেন্টারের পরিচালক মো. মামুনের সহায়তায় বাবলা দে ভর্তি পরীক্ষার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

একই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ফলাফল ও সরকারিভাবে প্রকাশিত ফলাফল একই। সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে এই ফলাফল প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই এ নিয়ে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানান জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাশ প্রথম আলোকে বলেন, দু-একজন ব্যক্তির কারণে সব পরিশ্রম ও সম্মান নষ্ট হলো। দুই সহকারী শিক্ষক আনোয়ার ও আনিছ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। অবশ্য আনিছ মাঝখানে কিছুদিন বান্দরবান সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ছিলেন। আর কম্পিউটার অপারেটর রিদুয়ানুল হক অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

তবে ফল ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক (গণিত) আনিছ ফারুক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ভর্তি পরীক্ষায় ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষক ছিলেন। আর তাঁর ছেলে কলেজিয়েট স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে এর সমাধানের কপি তিনি বাসায় নিয়ে যান। ছেলে পরীক্ষায় কয়টি শুদ্ধ উত্তর দিয়েছে, তা জানার জন্য তিনি এই সমাধান কপি নেন। কিন্তু ছেলের গৃহশিক্ষক মামুন বাসায় এসে তার ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন।

আর আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা ব্যস্ত পাওয়া যায়। পরে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

BD Online media

kol