ব্রাজিলের সঙ্গে বার্সেলোনার যোগটা দারুণ। অনেকেই এটিকে ‘ব্রাজিলোনা-লিংক’ হিসেবে বলতে পছন্দ করেন। ব্রাজিলের বড় বড় তারকাই তাঁদের ক্যারিয়ারের একটা সময় বার্সেলোনার জার্সি বেছে নিয়েছিলেন।

এর নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বার্সেলোনা যে সব সময়ই হয়ে উঠেছে ইউরোপীয় ফুটবলে ব্রাজিলীয় তারকাদের সাফল্যের মঞ্চ। ন্যু ক্যাম্পে নাম লেখানো প্রায় সব ব্রাজিলীয় ফুটবলারই সাফল্য পেয়েছেন। বার্সার হয়ে জিতেছেন লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ। এর পাশাপাশি কয়েকজন বার্সার জার্সিতেই জিতেছেন নানা ধরনের ব্যক্তিগত পুরস্কার।

বিভিন্ন সময় ন্যু ক্যাম্প মাতানো ব্রাজিলীয় ফুটবলারদের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরানো যাক…

রোনালদিনহো
অনন্য ফুটবলশৈলী দিয়ে মাঠ মাতিয়েছিলেন এই ব্রাজিলীয় তারকা। রোনালদিনহোকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাদীপ্ত ফুটবলারের মর্যাদা দেন। তাঁর ড্রিবলিং ছিল ছন্দময়। রোনালদিনহোর পায়ে বল আসা মানেই ছিল দর্শকদের জন্য নিশ্চিত বিনোদন। ২০০৩ সালে ইংলিশ তারকা ডেভিড বেকহামকে দলে আনতে চেয়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু বেকহামকে যখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারাতে হলো, তখন রোনালদিনহোকে পিএসজি থেকে দলে টানে বার্সা। কিন্তু সে সময়ের বার্সা সভাপতি হুয়ান লোপার্তা ভাবতেও পারেননি ভবিষ্যতে রোনালদিনহো দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন।

বার্সায় এসে রোনালদিনহো দলের বাজে সময় দূর করেছিলেন। দলকে আবার বানিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের হুমকি। প্রথম মৌসুমে দলকে লিগ রানার্সআপ বানিয়েছিলেন। অথচ সেবারই মৌসুমের মধ্যভাগ পর্যন্ত বার্সেলোনা পয়েন্ট তালিকার ১২তম স্থানে আটকে ছিল। দ্বিতীয় মৌসুমেই তিনি বার্সার হয়ে লা লিগ জেতেন। ২০০৬ সালে জেতেন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ।

রোনালদো
বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবেই ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করেছেন রোনালদো নাজারিও। এই রোনালদোকে ১৯৯৬ সালে হল্যান্ডের পিএসভি আইন্দোভেন থেকে সে সময়ের দলবদলের রেকর্ড ১৯.৫ মিলিয়ন ডলারে বার্সা ন্যু ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিল। ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে বার্সার জার্সি গায়ে রোনালদো কাটিয়েছিলেন স্বপ্নের মতো একটা মৌসুম। ৪৯ ম্যাচে করেছিলেন ৪৭ গোল।

তরুণ বয়সে রোনালদো তাঁর পায়ের কারুকাজ আর গতি দিয়ে বড় বড় ডিফেন্ডারের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ ফুটবল দুনিয়ার বড় বড় বিশেষজ্ঞের অনেকেই তাঁকে ইতিহাসসেরা কিংবদন্তি ফুটবলারদের কাতারে দাঁড় করিয়েছিলেন। বার্সেলোনার হয়ে তিনি জিতেছেন উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ, কোপা ডেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। ১৯৯৬ সালে তিনি ফিফার বর্ষসেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার পান। তাঁর বয়স তখন মাত্র ২০। ১৯৯৭ সালে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। লিগে ৩৭ ম্যাচে করেছিলেন ৩৪ গোল। সে মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলে গোল্ডেন বুট পুরস্কারটাও নিজের করে নিয়েছিলেন রোনালদো। এই ব্রাজিলীয় গ্রেট অবশ্য বার্সা ছেড়েছিলেন ক্লাবটির ওপর বিরক্ত হয়েই। সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত ভালো ছিল না দুই পক্ষের। বার্সেলোনা থেকে যোগ দিয়েছিলেন ইন্টার মিলানে।

রোমারিও
খুব বেশি দিন বার্সেলোনায় খেলেননি রোমারিও। সাকল্যে দেড় মৌসুম। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই সম্ভব প্রায় সবকিছুই পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে লা লিগা জিতেছিলেন। সেই মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা তো হয়েছিলেনই, লিগের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিও নিজের করে নিয়েছিলেন। এমনকি ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারেও আর কাউকে হাত দিতে দেননি। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ইয়োহান ক্রুইফের ‘স্বপ্নের বার্সেলোনা’ দলের অংশ হিসেবে ন্যু ক্যাম্পে এসেছিলেন ব্রাজিলীয় তারকা। তাঁর সঙ্গী-সাথিরা ছিলেন রিস্টো স্টইচকভ, রোনাল্ড কোম্যান, হোসে মারি বাকেরো, পেপ গার্দিওলা ও মাইকেল লাউড্রপের মতো খেলোয়াড়েরা। ১৯৯৪ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালটি অবশ্য ভুলে যেতেই চাইবেন রোমারিও । এসি মিলানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে শিরোপা জয়ের কড়া ফেবারিট হওয়া সত্ত্বেও বার্সা হেরে যায় ৪-০ গোলে।

রিভালদো
ফ্রি কিকের রাজা বলা হতো রিভালদোকে। সেট-পিসের জন্য বিখ্যাত এই ব্রাজিলীয় ফুটবলার ১৯৯৭ সালে বার্সেলোনায় নাম লেখান। রোনালদো ইন্টার মিলানে চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটি ভরাট করতেই রিভালদোর ন্যু ক্যাম্পে পা রাখা। দীর্ঘদেহী, প্রতিভাবান এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ত্রাস। যেকোনো জায়গা থেকেই গোল করতে পারতেন তিনি।

১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর বার্সেলোনায় খেলেছেন রিভালদো। গোল করেছেন ১৩০টি। দলকে লা লিগা ও কোপা ডেল রে জিতিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন তিনি। সেবারই জিতেছিলেন ব্যালন ডি’অর।

দানি আলভেজ
সেভিয়াতে দুর্দান্ত সময় কাটানোর পর ২০০৮ সালে ২৩ মিলিয়ন ইউরোয় বার্সেলোনায় নাম লেখান দানি আলভেজ। সেভিয়াতে তিনি জিতেছিলেন উয়েফা ইউরোপা লিগ, উয়েফা সুপার কাপ, কোপা ডেল রে, স্প্যানিশ সুপারকাপ। সেভিয়ার হয়ে নিজেকে তিনি প্রমাণ করেছিলেন আক্রমণের সারথি হিসেবেও। গোল করেছিলেন ৪টি। সহায়তা করেছিলেন ৩টিতে। ৪৩ ম্যাচে নিজেতে প্রমাণ করেছিলেন দুর্দান্ত এক উইংব্যাক হিসেবে।

বার্সায় আসার পর নিজেকে আরও মেলে ধরেন আলভেজ। পেপ গার্দিওলার স্বর্ণসময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। ২০০৮-০৯ ও ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সার ট্রেবল জয়ে দারুণ ভূমিকা ছিল এই ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডারের।

নেইমার
এই মৌসুমেই রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে নাম লিখিয়েছেন নেইমার। দলবদলের কারণে অনেকেই তাঁর সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু এটা ঠিক যে বার্সেলোনার হয়ে খেলা অন্যতম সেরা ব্রাজিলীয় ফুটবলার তিনি।

ব্রাজিলীয় ক্লাব সান্তোসের হয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পরিণত হয়েছিলেন ফুটবল দুনিয়ার অন্যতম প্রতিভাবান ফুটবলারে। ২০১৩ সালে সান্তোস থেকে নাম লেখান বার্সায়।

বার্সেলোনার হয়ে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবেন। লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে বিখ্যাত ‘এমএসএন’ ত্রয়ীর অংশ হয়েছিলেন। যে ত্রয়ী বার্সেলোনার প্রতিপক্ষ ঘায়েলের অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। এই তিনজন মিলে রেকর্ড গড়েছেন, গোলের পুরোনো রেকর্ড ভেঙেছেন। বার্সার জার্সি গায়ে ৪ বছর ১০টি ট্রফি জিতেছেন। গোল করেছেন ১০৫টি।

BD Online Media