মাশরাফি বিন মুর্তজা ও মুশফিকুর রহিমের এই অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়েছে? চোখ বেঁধে বলের ভেতরের বিশেষ শব্দ শুনে ক্রিকেট খেললেন তাঁরা। খেলার পর তাঁদের উপলব্ধি, কাজটা ভীষণ কঠিন! পরে এ দুজনের সঙ্গেই খেলে কঠিন কাজটাই অনায়াসে করে দেখাল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুরা।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের খেলার দক্ষতা দেখে মুগ্ধ মাশরাফি-মুশফিক বলেছেন, এই শিশুরা প্রমাণ করেছে সুযোগ পেলে তারাও সবকিছু করতে পারে। দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের চেয়ে তাদের দক্ষতা কোনো অংশেই কম নয়। আজ শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডির সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে এই দুই ক্রিকেটার উপস্থিত হয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের উৎসাহ দেন। শিশুদের কথা শোনেন, তাদের সঙ্গে সেলফি তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প অ্যাবিলিটি ইউএসএ এবং বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিরোজ ফর অল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের এই সুযোগ করে দেয়।
বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও জাতীয় দলের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিমকে কাছে পেয়ে শিশুরা ভীষণ আনন্দিত। প্রথম আলোকে তারা বলে, তাদের মতো শিশুদের ক্রিকেট খেলার আয়োজন তাও আবার দুই তারকার সঙ্গে খেলার যে স্মৃতি তা তারা কোনো দিন ভুলবে না। আয়োজকদের ধন্যবাদ দিয়ে দু-একজন শিশু জানিয়ে দিল, তারাও বড় হয়ে বড় ক্রিকেটার হবে।
হিরোজ ফর অলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড. রেহনুমা করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই সন্তানদের গতানুগতিকভাবে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চায়। কিন্তু তাদের আসলে কোনটা স্বপ্ন তা তেমন জানা হয় না। স্বপ্ন পূরণ না করতে পেরে শিশু-কিশোরদের অনেকেই বিষণ্নতা, মাদকসহ বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। আমরা স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করছি। তাদের সামনে মেন্টর হাজির করছি।’
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের কথা জানিয়ে স্টেট ইউনির্ভাসিটি অব নিউইয়র্কের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক রেহনুমা করিম বলেন, ‘আমরা দেখাতে চেয়েছি এই শিশুরা কোনো অংশে কম নয়। তাদের মেধা আছে। প্রয়োজন শুধু পাশে থাকা। আর মাশরাফি বা মুশফিককে কাছে পেয়ে যাতে তাদের স্বপ্নটা চাঙা হয়, তার চেষ্টা করেছি।’

আজকের এ আয়োজনে অ্যাসিস্ট্যান্ট ফর ব্লাইন্ড (এবিসি) নামের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্লাসে পড়া ৩০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে অংশ নেয়। আর এই ৩০ জনকে সহায়তা করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন ৩০ জন তরুণ, যাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই তরুণদের (কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন) দুদিন প্রশিক্ষণ নিতে হয়, প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাঁদেরও চোখ বেঁধে দেওয়া হয় যাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থাটা অনুভব করতে পারেন।
দুই দিন কাউন্সিলরদের প্রশিক্ষণ এবং গতকাল শুক্রবার থেকে মূল আয়োজনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ২২ জন ও ৮ জন মেয়ে অংশ নেয়। আজ ছিল আয়োজনের শেষ দিন। দিনব্যাপী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্প অ্যাবিলিটিজ ইউএসএর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক লরেন লিবারম্যান, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনির্ভাসিটি অব সাউথ ক্যারোলিনার ফিজিক্যাল এডুকেশন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট অধ্যাপক এ্যালি ব্রায়ান, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ স্টুডেন্ট মেগ্যান আরউইন, হিরোজ ফর অলের বোর্ড সদস্য মনিরা রহমান প্রমুখ।
প্রতিবন্ধিতা এবং অ্যাডাপ্টেড ফিজিক্যাল এডুকেশন নিয়ে ১৭টি বইয়ের লেখক (বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য) লরেন লিবারম্যান সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সারাক্ষণই ব্যস্ত ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে, ১৯৯৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘এ লস অব সাইট, নেভার এ লস অব ভিশন’ স্লোগানকে সামনে রেখে লরেন লিবারম্যান ক্যাম্প অ্যাবিলিটিজ ইউএসএ পরিচালনা করছেন। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যসহ বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশে এ ধরনের ক্যাম্প পরিচালনা করেছেন। আর বাংলাদেশে হিরোজ ফর অল যাত্রা শুরু করেছে গত বছর। সমাজের পিছিয়ে পড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে দৃষ্টিসম্পন্নদের খেলার এ আয়োজন এবারই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো।

BD Online Media

blind 2